নিয়মিত কাজু বাদাম খাওয়ার উপকারিতা ও খাওয়ার নিয়ম

Apetfeed

শারীরিক উপকারিতার দিক থেকে কাজু বাদামের মাহাত্ম অস্বীকার করার নয়। এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, দিনে ৩-৪ টি করে কাজু বাদাম খেলে শরীরে খনিজ পদার্থ ও পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি পূরণ হয়।
এতে ভিটামিনের অধিক পরিমাণের কারনে ডাক্তাররা একে ”প্রাকৃতিক ভিটামিন ট্যাবলেট” বলেও উল্লেখ করে থাকেন। এতে রয়েছে প্রচুর খনিজ পদার্থ ও পুষ্টিগুণ। কাজু বাদামের ইংরেজি প্রতিশব্দ – cashew nuts ।

কাজু বাদাম (cashew nuts) এর উপকারিতাঃ
প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, খনিজ এবং ভিটামিন রয়েছে কাজু বাদামে।

– টিউমার প্রতিরোধে কাজু বাদামের ভূমিকা অপরিসীম। এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্যান্সার সেলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
– কাজু বাদামের ম্যাগনেসিয়াম ব্লাড প্রেসারকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম। এ কারনে ব্লাড প্রেসার আক্রান্ত রোগীরা খাদ্য তালিকায় কাজু বাদাম রাখতে পারেন।
– সুস্থ হার্টের জন্য কাজুর বিকল্প ভাবার কোনো কারন নেই।
– এই খাবারে এক ধরনের মোনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে যার নাম ওলিসিক। ওলিসিক শরীরের খারাপ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়তা করে।
– কাজু বাদামে প্রচুর পরিমাণে কপারের উপস্থিতি রয়েছে। কপার চুলের গোড়াকে শক্ত করার পাশাপাশি চুলের ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। (আরও পড়তে পারেনঃ চুল পড়া রোধে ৫ টি সহজ ঘরোয়া সমাধান)
– কপার শরীরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ এনজাইমের পরিমাণ বৃদ্ধি করে চুলের রঙকে আরো গাঢ় করে এবং স্থায়ীত্ব প্রদান করে।
– কাজু বাদামের ভাইরাস প্রতিরোধে খুবই গুরত্বপূর্ণ। তাই যাদের রোগ্রতিরোধ ক্ষমতা কম তারা খাদ্যাভাসে এই বাদামকে যুক্ত করতে পারেন।

এছাড়াও, স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধিতে কাজু বাদামের ভূমিকা অনস্বীকার্য। শিক্ষার্থীদের মেধাশক্তি বৃদ্ধিতে এবং বয়স্কদের স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর জন্য চিকিৎসকরা কাজুবাদাম খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

কাজুবাদামের ম্যাগনেসিয়াম মস্তিষ্কের টিস্যুর শক্তি বাড়িয়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। কাজুবাদাম কে আমরা ব্রেনের পাওয়ার বুস্টারও বলে থাকি।

খালি পেটে কাজু বাদাম খাওয়ার উপকারীতাঃ
কাজু বাদাম শুধু তার স্বাদের জন্য নয়, এর পুষ্টিগুণের জন্যও বিখ্যাত। তবে অনেকেই খালি পেটে খাওয়ার উপকারিতা সম্পর্কে জানেন না। তাই এই বিষয়ে নীচে আলোকপাত করা হলোঃ

১. শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়কঃ
কাজুবাদামে দেহে শক্তির মূল উপাদান কার্বোহাইড্রেট রয়েছে। আমাদের শরীর এটিকে ভেঙ্গে গ্লুকোজে রূপান্তর করে। গ্লুকোজ আমাদের দেহের কোষ, টিস্যু এবং অঙ্গগুলির জন্য শক্তির প্রধান উৎস। খালি পেটে কাজু খেলে আমাদের পরিপাকতন্ত্র দ্রুত গ্লুকোজকে কাজ করতে বাধ্য করে।

২. কোষ্ঠকাঠিন্যের মহৌষধঃ
সকালে খালি পেটে কাজুবাদাম খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। কাজুবাদামে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকে যা হজমে সহায়তা করার সাথে সাথে কোষ্ঠকাঠিন্যেও সাহায্য করে। এই সুস্বাদু বাদাম রেচন প্রক্রিয়াতেও সহায়তা করে।

৩. হাড়ের গঠন মজবুত করেঃ
এক গবেষণায় দেখা গেছে, কাজুতে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং পটাসিয়াম রয়েছে যা হাড়ের বিকাশ ও বলবৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

৪. ওজন কমাতেঃ
বর্তমান সময়ে স্থূলতা একটি বিশাল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস ও অনিয়ম আমাদের ওজন বৃদ্ধিতে কাজ করছে। একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে ফাইবার সমৃদ্ধ কাজু বাদাম ওজন নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে।এছাড়াও, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণেও এটির প্রভাব দেখা যায় যা ওজন নিয়ন্ত্রণকে প্রভাবিত করে। একই সাথে কাজুতে স্থূলতাবিরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে, ফলে এটি স্থূলত্বের ঝুঁকিও হ্রাস করে। (পড়ুন – অতিরিক্ত ওজন কমানোর সহজ উপায় )

কাজু বাদাম খাওয়ার নিয়ম কী?
বর্তমানে আমরা কেক, চকোলেট, পেস্টি, পায়েস, আচার ইত্যাদিতে স্বাদ বৃদ্ধি করার জন্য কাজু বাদাম ব্যাবহার করে থাকি। তবে কাজু বাদাম খাওয়ার ক্ষেত্রে বয়স ও শারীরিক অবস্থা ভেদে কিছু নিয়ম মেনে চললে এর পুষ্টিগুণ পরোপুরি পাওয়া যেতে পারে।

ক) দুই বছরের কম ছোট বাচ্চাদের জন্যঃ
এই বয়সের বাচ্চদের কাজু বাদাম খাওয়ানোর ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। এটি তাদের গলায় আটকে যেতে পারে। তাদেরকে অন্য খাবারের সাথে কাজু বাদাম মিশিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে। প্রতিদিন ১ বার বা সপ্তাহে ৩ বার এবং একসাথে ১০-১৫ বাদাম খাওয়ানো যেতে পারে।

খ) দুই বছরের চেয়ে বড় বাচ্চাদের জন্যঃ
এই বয়সের বাচ্চারা একেকবারে ১৫-২০ টি বাদাম খেতে পারে। প্রতিবার যদি তারা প্রায় ৩০ টি বাদাম বা ৫০ গ্রাম বাদাম খায়, তাহলে তাদের প্রতি সপ্তাহে সর্বোচ্চ 3 বার খেতে দেওয়া উচিত।

গ) গর্ভবতী মায়েদের জন্যঃ

গর্ভবতী মহিলাদের জন্য প্রতিদিন ১০ গ্রাম -৫০ গ্রাম কাজু বাদাম খাওয়া ভালো যা ৩৫-৬৫ টি বাদামের সমতুল্য। যদি বেশি খাওয়া হয়ে যায়, তাহলে আপনার সপ্তাহে মাত্র ২-৩ বার করে খাওয়া উচিত। এই‌ ক্ষেত্রে আপনি আপনার ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে বাদাম খাওয়ার নিয়ম তৈরি করে নিতে পারেন।

ঘ) ডায়াবেটিস রোগী ও অন্যদের জন্যঃ
বয়স্কদের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ৫০ গ্রাম বা ৩০ টি কাজু বাদাম খাওয়া উচিত যা তাদের জন্য যথেষ্ট। একজন প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিবারে ৩০ থেকে ৩৫ টি বাদাম খেতে পারেন এবং প্রতিবারে ৫০ গ্রাম থেকে ৭০ গ্রাম করে খেতে পারেন। ডায়াবেটিস কমানোর জন্য করনীয় কি কি তা জানতে এখানে ক্লিক করুন।

কাজু বাদাম ভিজিয়ে খাবেন কেন?

১. সাইট্রিক এসিড দূর করেঃ
কাজুবাদামের বাইরের আবরণে সাইট্রিক এসিড বিদ্যমান থাকে। এই এসিড মানুষের ক্ষতি করে। বেশি মাত্রায় এ এসিড দেহে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা সৃষ্টি করে। এটি মিনারেলের শোষণে সমস্যা করে। খাওয়ার আগে বাদাম ভিজিয়ে রাখলে এই সাইট্রিক এসিড নিষ্ক্রিয় হয়।

২. ইরিটেবল বাউয়েল সিনড্রম কমায়ঃ
কাজুর মধ্যে থাকা ইনহিবিটর এনজাইম গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা তৈরি করে। একই সাথে ইরিটেবল বাউয়েল সিনড্রম তৈরি করে। বাদাম খাওয়ার আগে ভিজিয়ে খেলে এই এনজাইম দূর হয়। যাঁরা গ্যাসট্রিকের সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের বাদাম ভিজিয়ে খাওয়াই উত্তম।

৩. ট্যানিন দূর হয়ঃ
বাদামে থাকা ট্যানিন হজমে সমস্যা তৈরি করে। ভিজিয়ে রাখলে ট্যানিন দূর হয়। সুতরাং বাদাম খাওয়ার পূর্বে ভিজিয়ে রাখাই ভালো।

৪. কোলনের কার্যক্রম ভালো করে:
বাদাম খাওয়ার পূর্বে ভিজিয়ে রাখলে কোলন থেকে বিষাক্ত পদার্থ দূর করে। এটি পুষ্টির সঠিক শোষণের জন্য ভালো।

৫. মিনারেলের শোষণ ব্যাহত করেঃ
সাইটিক এসিড মিনারেলের শোষণকে ব্যাহত করে। এটি শরীরের মিনারেলের ঘাটতি তৈরি করতে পারে। তাই বাদাম ভিজিয়ে খান, আগেই বলেছি এতে বাদামের ক্ষতিকর এসিড দূর হয়।

কীভাবে কাজু বাদাম ভেজাবেন?
প্রথমে একটি পাত্রে পানি নিয়ে বাদাম ভেজান। ভেজানোর সময় অবশ্যই ফুটানো বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করবেন‌।

এর মধ্যে দুই চামচ লবণ দিন এবং ঢেকে দিন। ছয় ঘণ্টা এভাবে ভিজিয়ে রাখুন। পানি ফেলে দিয়ে এবার আপনি আপনার কাজুগুলো খেতে পারেন।

কাজু বাদামের পার্শ-প্রতিক্রিয়াঃ
প্রবীণরা বলে থাকেন, কোনো কিছুই অতিরিক্ত ভালো হয় না। কাজু বাদামের অনেক পুষ্টিগুণ থাকলেও এর অতিরিক্ত গ্রহন কিছু পার্শ-প্রতিক্রিয়া বয়ে নিয়ে আসতে পারে।

কাজু বাদাম একটি ফাইবার জাতীয় খাবার- তাই এটি বেশি খেলে পেটে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
আমরা মাছ, মাংস ও ডালের সাথে প্রোটিন গ্রহণ করে থাকি। তাই বেশি প্রোটিন সমৃদ্ধ কাজু বাদাম কিডনির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। (পড়ুন – কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার )
এই বাদামে রয়েছে ম্যাগনেসিয়াম যা অনেক ওষুধের কার্যক্রমে বাধা প্রদান করে।
অনেকের আবার বাদামে এলার্জি থাকে। (পড়ুন-এলার্জির ঘরোয়া সমাধান)